বৈশাখ শুরু। ফলে প্রতিবছরের মতো কোরবানির আগের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আওতাধিন গরুর বাজারগুলো টেন্ডার দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আর প্রতিবছরের মতোই এবছরও গরুবাজার নিয়ে চলছে টেন্ডার-টেন্ডার খেলা। অবশেষে শুরু হাট কালেকশনের নামে লুটপাটের প্ল্যান।
এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবারের মতো এবারও তিন দফা টেন্ডার আহ্বান করেও চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে বড় পশুর বাজার সাগরিকা গরুর বাজারের ইজারা সম্পন্ন করা হয়নি।
গত বছরের মতো হাট কালেকশনের পথে চলছে সাগরিকা গরুর বাজারটি। গতবারও এই পথে হেঁটে ২ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব কম আয় হয়েছে চসিকের। যা মূলত হয়েছে লুটপাট। ঠিক এবারও সাগরিকা গরুর বাজার নিয়ে টেন্ডার-টেন্ডার খেলায় হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নিয়মানুযায়ী চসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন চারটি হাট এবং ঘাট পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র সময়ের জন্য ইজারা দেয়া হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ থেকে যাতে ঠিকাদার কার্যক্রম শুরু করতে পারেন সেভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
এবছরও সেভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে গরুর বাজার ইজারা দেয়ার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু টেন্ডারে কেউ অংশগ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে মার্চ মাসে আহ্বান করা হয় দ্বিতীয় দফা টেন্ডার। তাতে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ফলে ওই টেন্ডার বাতিল করা হয়।
গত ১ এপৃল পুনরায় তৃতীয়দফা টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে পাঁচটি দরপত্র বিক্রি হয়। এর মধ্যে টেন্ডার জমা পড়ে তিনটি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা জনৈক ইরফান সরওয়ারী খাঁন সরকারের ভ্যাট ট্যাক্সসহ ৮ কোটি ৮৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দর উল্লেখ করে।
দ্বিতীয় দরদাতা ফজলে আলিম চৌধুরী (মীরা মেরিন) ভ্যাট ট্যাক্সসহ ৮ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ২৩৩ টাকা এবং তৃতীয় দরদাতা সাজ্জাদ হোসাইন ভ্যাট ট্যাক্সসহ ৭ কোটি ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭৫ টাকা দর উল্লেখ করেন। কিন্তু প্রত্যাশীত দরের অজুহাতে এই টেন্ডারও বাতিল করা হয়।
ইতোমধ্যে বছর শুরু হওয়ায় গত পহেলা বৈশাখ থেকে বিশাল এই গরু বাজারের ইজারা আবারো হাট কালেকশনে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে চতুর্থ দফা টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যা প্রহসন বলে মনে করছেন ইজারাদাররা।
ইজারাদারদের ভাষ্য, হাট কালেকশনের নামে লাখ লাখ টাকা নয় ছয় করার সুযোগ তৈরির জন্যই ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে না। এতে সরকার দেড় কোটি টাকারও বেশি নিশ্চিত ভ্যাট ও ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হবে। সরকারের এই রাজস্ব লুটে খাবে হাট কালেকশনের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি ও চসিকের সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তারা।
ইজারাদাররা গতবছরের বিষয়টিকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনে বলেন, গতবছর একাধিক টেন্ডারে পর সর্বোচ্চ সাগরিকা গরুর বাজারের দর উঠেছিল ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেই টেন্ডার সম্পন্ন না করে হাট কালেকশনের নামে প্রথম চার মাসের জন্য দেয়া হয় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। পরে দুই মাসের জন্য দেয়া হয় ২১ লাখ টাকায় এবং পরবর্তীতে আবার ৬ মাসের জন্য দেয়া হয় ৯৯ লাখ টাকায়।
টেন্ডারে সাড়ে সাত কোটিরও বেশি টাকায় বাজার ইজারা দেয়া না হলেও হাট কালেকশনে পাওয়া যায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার কম। এর মধ্যে হাট কালেকশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ৫৫ লাখ টাকা আটকে রেখেছেন। পুনরায় উক্ত ব্যক্তিকে হাট কালেকশনের দায়িত্ব দেয়ায় সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে তৃতীয় দফা টেন্ডারের পর বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে সিদ্ধান্ত চাওয়ার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করে বলা হয়েছে যে, ইতোমধ্যে চতুর্থ দফা টেন্ডার আহ্বানের প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে চসিকের রাজস্ব বিভাগ।
জানা গেছে, চসিকের রাজস্ব বিভাগে কর্মরত রতি-মহারতি কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাট কলেকশনের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যক্তির দহরম-মহরম সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নানা কুটকৌশলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সহিত ভাগবাটোয়ারা চলে। এক্ষেত্রে কোটি টাকার হিসেব-নিকেশ হয়। টেন্ডারে অংশ নেয়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিষয়টিতে দৃষ্টিপাত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সিটি মেয়রের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে ।
বিষয়টি নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিন দফা টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম দফায় কেউ টেন্ডার নেননি, দ্বিতীয় দফায় মাত্র একজন এসেছিলেন। তৃতীয় দফায় তিনজন দরপত্র দাখিল করলেও প্রত্যাশিত দর পাওয়া যায়নি। তাই হাট কালেকশনের উদ্যোগ নিতে হয়েছে। হাট কালেকশন টেন্ডারে উল্লেখিত দরের চেয়ে বেশি না কম-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারবেন না বলে জানান।
এ বিষয়ে কথা বলতে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনিও কোনরকম সাড়া দেননি।